আইপিএলের ‘কনটেন্ট-ফার্স্ট’ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সরব বিরাট কোহলি
Contents
আইপিএলে ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল চাপের মুখে খেলোয়াড়রা
গত কয়েক বছরে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) কেবল একটি ক্রিকেট টুর্নামেন্ট থেকে বিশাল বিনোদন ইভেন্টে পরিণত হয়েছে। ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর সোশ্যাল মিডিয়া টিম এখন মাঠ ও ড্রেসিংরুমের প্রতিটি মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করতে মরিয়া। এই ‘কনটেন্ট-ফার্স্ট’ সংস্কৃতির প্রভাব নিয়ে মুখ খুলেছেন ভারতের কিংবদন্তি ক্রিকেটার বিরাট কোহলি। তিনি মনে করেন, এই অহেতুক চাপ খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত এবং পেশাদার জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অনুশীলনের ময়দানেও ক্যামেরার চোখ
আরসিবি পডকাস্টে কথা বলতে গিয়ে বিরাট কোহলি জানান যে, অনুশীলনের সময় ছয়টি ক্যামেরা তাকে অনুসরণ করে, যা অত্যন্ত অস্বস্তিকর। তিনি বলেন, ‘আপনি যখন অনুশীলনে যান, তখন চারপাশে অনেকগুলো ক্যামেরা আপনাকে অনুসরণ করছে। এটা খুব একটা স্বস্তিদায়ক অনুভূতি নয়। নিজের খেলার উন্নতির জন্য খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা প্রয়োজন। সব কিছু ক্যামেরাবন্দি হলে তা আর স্বাভাবিক বা অর্গানিক থাকে না।’
কোহলির মতে, অনুশীলনের সময় নতুন কোনো শট বা কৌশল নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ সবটাই রেকর্ডিং হচ্ছে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘কেউ আমাকে আমার মাঠের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে বিচার করুক, কিন্তু নেপথ্যে আমি কীভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছি তা নিয়ে বিচার করার অধিকার কারও নেই।’
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও খেলোয়াড়দের স্বাধীনতা
বিরাট কোহলি তার ক্যারিয়ারের বড় সময় কাটিয়েছেন লেন্সের সামনে। বলিউড তারকা অনুষ্কা শর্মার সাথে তার বিয়ের পর থেকে তিনি পাপারাজ্জিদের নিয়মিত লক্ষ্যবস্তু। এই চাপ থেকে বাঁচতে তিনি এখন লন্ডনে আবাস গড়েছেন, কেবল আন্তর্জাতিক ম্যাচ ও আইপিএল খেলার জন্যই তিনি ভারতে ফেরেন। কিন্তু আইপিএলের মাঠেও সেই একই চাপ তাকে তাড়া করছে।
এক মজার কিন্তু বিরক্তিকর অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি কেন উইলিয়ামসনের সাথে কথা বলছিলাম। আমরা একটি সিরিয়াস আলোচনা করছিলাম, এমন সময় লখনউ সুপার জায়ান্টসের সেই রোবটিক কুকুর (চ্যাম্পাক) এসে সেখানে হস্তক্ষেপ শুরু করে। আমি সেই অপারেটরকে কুকুরটিকে সরিয়ে নিতে বলি। একজন বন্ধুর সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলার জায়গাটুকুও যেন নেই।’
ডিজিটাল কন্টেন্টের সীমা টানা প্রয়োজন
কোহলি মনে করেন, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর উচিত খেলোয়াড়দের স্বাচ্ছন্দ্যকে প্রাধান্য দেওয়া। তিনি স্পষ্ট বলেন, ‘আমাদের একটি সীমারেখা টানতে হবে। এটা বোঝা খুব জরুরি যে, একজন খেলোয়াড় ক্যামেরার সামনে আসতে আগ্রহী কি না। আমার মনে হয় এই বিষয়গুলো বিবেচনা করা প্রয়োজন, কারণ এটি এখন মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে চলে গেছে।’
আরসিবির হয়ে কোহলির লক্ষ্য
মাঠের বাইরের এসব বিতর্ক সত্ত্বেও কোহলি তার খেলায় সম্পূর্ণ মনোযোগী। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর হয়ে তিনি টানা দ্বিতীয় শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছেন। চলতি মৌসুমে তিনি ইতিমধ্যে চারশো রানের গণ্ডি পার করেছেন এবং অরেঞ্জ ক্যাপ জেতার দৌড়ে অন্যতম ফেভারিট। সম্প্রতি কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিপক্ষে দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন কেন তাকে আধুনিক ক্রিকেটের অন্যতম সেরা বলা হয়।
টুর্নামেন্টের ইতিহাসে নয়টি সেঞ্চুরি এবং টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে ১৪,০০০ রানের মালিক কোহলি এখন কেবল দলের সাফল্যের দিকে তাকিয়ে। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু ইতিমধ্যে প্লে-অফে নিজেদের জায়গা নিশ্চিত করেছে। রজত পতিদারের নেতৃত্বাধীন দলটি তাদের বাকি ম্যাচগুলোতে জিতে পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষ দুইয়ে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত, ক্রিকেটের বাণিজ্যিকীকরণ বাড়লেও খেলোয়াড়দের মানসিক শান্তি ও গোপনীয়তা রক্ষার যে দাবি কোহলি তুলেছেন, তা নিয়ে ক্রিকেট মহলে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। খেলা ও ক্যামেরার মধ্যে এই ভারসাম্য বজায় রাখাটাই এখন বিসিসিআই এবং ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।