নাহিদ রানা কি এবার আইপিএলে? বাবর আজমকে কাঁপানোর পর সতর্কবার্তা তামিম ইকবালের
Contents
- 1 ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের জোয়ার এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ
- 2 আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পক্ষে তামিম ইকবালের জোরালো যুক্তি
- 3 “অর্থ দিয়ে দেশের হয়ে খেলার আবেগ কেনা যায় না”
- 4 ফুটবলের উদাহরণ এবং তরুণদের প্রতি বার্তা
- 5 পাকিস্তানের বিপক্ষে নাহিদ রানার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স
- 6 পিএসএল এবং বাবর আজমের সাথে পূর্ব অভিজ্ঞতা
- 7 উপসংহার: দেশের গৌরব বনাম ফ্র্যাঞ্চাইজির মোহ
ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের জোয়ার এবং আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ
বর্তমান ক্রিকেট বিশ্বে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের প্রভাব দিন দিন বেড়েই চলেছে। অনেক ক্রিকেটারই এখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চেয়ে বিভিন্ন দেশের ঘরোয়া টি-২০ বা টি-১০ লিগকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন। এই প্রবণতা ক্রিকেট মহলে একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল), পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল), বিগ ব্যাশ লিগ (বিবিএল) এবং দ্য হান্ড্রেডের মতো টুর্নামেন্টগুলো ক্রিকেটারদের বিশাল অঙ্কের চুক্তি এবং বিশ্বব্যাপী পরিচিতি পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে অনেক তরুণ খেলোয়াড়ই এই লোভনীয় দুনিয়ার দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন।
সম্প্রতি টাইমস অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক এবং বিসিবির অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি তামিম ইকবাল ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট এবং তরুণ পেস সেনসেশন নাহিদ রানাকে নিয়ে নিজের মতামত প্রকাশ করেছেন। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, কেন ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের এই রমরমা ব্যবসার মাঝেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গুরুত্ব কোনোভাবেই কমে যেতে পারে না।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পক্ষে তামিম ইকবালের জোরালো যুক্তি
সাক্ষাৎকারে তামিম ইকবালকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, নাহিদ রানার মতো তরুণ ও প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা যদি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট বাদ দিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটকে বেছে নেন, তবে তা দেশের ক্রিকেটের জন্য কতটা ক্ষতিকর হবে? এর জবাবে তামিম অত্যন্ত ইতিবাচক এবং বাস্তবসম্মত দৃষ্টিকোণ থেকে নিজের মতামত তুলে ধরেন।
তামিম ইকবালের মতে, বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী হওয়া সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এখনো অধিকাংশ ক্রিকেটারের হৃদয়ে একটি বিশেষ আবেগীয় স্থান দখল করে আছে। তিনি বিশ্বাস করেন, অনেক cricketer-ই বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজি দল থেকে কোটি কোটি টাকার প্রস্তাব পেয়ে থাকেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা দেশের হয়ে খেলাটাকেই তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করেন।
যদিও সাবেক এই ড্যাশিং ওপেনার স্বীকার করেছেন যে কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটতেই পারে, যেখানে দু-একজন খেলোয়াড় সম্পূর্ণভাবে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটকেই তাদের পেশা হিসেবে বেছে নিতে পারেন। তবে সামগ্রিকভাবে বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই দেশের হয়ে খেলাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেবেন বলে তিনি আশাবাদী।
“অর্থ দিয়ে দেশের হয়ে খেলার আবেগ কেনা যায় না”
ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট বনাম আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ে নিজের বক্তব্যকে আরও জোরালো করতে তামিম ইকবাল বলেন, “এমন কিছু জিনিস আছে যা টাকা দিয়ে কেনা যায় না, আর তা হলো নিজের দেশের হয়ে খেলার আবেগ ও গৌরব। যদি টাকার খেলাই সব হতো, তবে বিশ্বের ৮০ শতাংশ ক্রিকেটারই ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের পথ বেছে নিতেন। ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের প্রতি আমার সর্বোচ্চ সম্মান রয়েছে, তবে যখন আপনি আপনার নিজের দেশের জন্য খেলবেন, সেই অনুভূতি এবং সম্মান আপনি কোনো টাকা দিয়ে কিনতে পারবেন না।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমাদের দেশেও অনেক সুপারস্টার ক্রিকেটার আছেন যারা বিশ্বের বিভিন্ন লিগ থেকে বড় বড় প্রস্তাব পান। কিন্তু দিনশেষে তারা দেশের হয়ে খেলতেই মাঠে নামেন। দেশের প্রতি এই ভালোবাসা এবং টান সরাসরি হৃদয় থেকে আসে।”
ফুটবলের উদাহরণ এবং তরুণদের প্রতি বার্তা
ক্রিকেটের এই পরিস্থিতিকে ফুটবলের সাথে তুলনা করে তামিম বলেন, “আমরা যদি ফুটবলের দিকে তাকাই, সেখানে খেলোয়াড়রা ক্লাবগুলো থেকে কোটি কোটি ডলার আয় করছেন। কিন্তু যখনই তাদের দেশের হয়ে খেলার সুযোগ আসে, তারা সবকিছু ছেড়ে জাতীয় দলের জার্সিতে মাঠে নেমে পড়েন। তাই আমি মনে করি, কিছু জিনিস অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না এবং দেশের হয়ে খেলার এই অনুভূতি কখনো পরিবর্তিত হবে না। হ্যাঁ, কিছু ব্যতিক্রম অবশ্যই থাকবে, তবে বেশিরভাগ ক্রিকেটারের ক্ষেত্রে এই মানসিকতা বদলাবে না।”
একই সাথে তামিম ইকবাল তরুণ পেসার নাহিদ রানার উদাহরণ টেনে বলেন যে, একজন তরুণ ক্রিকেটারের জন্য ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের কোটি টাকার অফার ফিরিয়ে দেওয়া কতটা কঠিন হতে পারে। বিশেষ করে যখন তারা বিশ্বজুড়ে টি-২০ ক্রিকেট খেলে অনেক বেশি অর্থ উপার্জন করতে পারেন, তখন জাতীয় দলের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটের কঠোর পরিশ্রম বেছে নেওয়াটা সত্যিই বড় চ্যালেঞ্জের।
পাকিস্তানের বিপক্ষে নাহিদ রানার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স
নাহিদ রানা সম্প্রতি পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে বিশ্ব ক্রিকেটের নজর কেড়েছেন। বাংলাদেশ দল পাকিস্তানের মাটিতে তাদের ২-০ ব্যবধানে হারিয়ে ঐতিহাসিক টেস্ট সিরিজ জয় লাভ করে। আর লাল-সবুজের এই অবিস্মরণীয় জয়ে নাহিদ রানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
পুরো টেস্ট সিরিজে নাহিদ রানা চার ইনিংসে মোট ১১টি উইকেট শিকার করেন। নিজের গতি এবং বাউন্স দিয়ে তিনি পাকিস্তানের শক্তিশালী ব্যাটিং লাইনআপকে বারবার বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছেন। সিরিজের প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৪০ রান দিয়ে ৫টি উইকেট নেওয়া ছিল তার ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা বোলিং পারফরম্যান্স। তার গতিশীল বোলিংয়ের সামনে পাকিস্তানের বিশ্বমানের ব্যাটার বাবর আজমকেও বেশ অসহায় দেখিয়েছে।
টেস্ট ক্রিকেটের পাশাপাশি ওয়ানডে সিরিজেও নাহিদ রানার পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। পাকিস্তানের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে তিনি ৮টি উইকেট শিকার করে নিজের কার্যকারিতা প্রমাণ করেন।
পিএসএল এবং বাবর আজমের সাথে পূর্ব অভিজ্ঞতা
পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজে আলোড়ন সৃষ্টি করার আগে নাহিদ রানা পাকিস্তান সুপার লিগেও (পিএসএল) নিজের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। পিএসএলে তিনি বাবর আজমের নেতৃত্বাধীন পেশোয়ার জালমি দলের হয়ে মাঠ কাঁপিয়েছিলেন। সেখানে পাঁচ ইনিংসে ৯টি উইকেট নিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিটিকে শিরোপা জেতাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি।
মজার ব্যাপার হলো, পিএসএলে যার অধীনে খেলেছিলেন, সেই বাবর আজমকেই পরবর্তীতে টেস্ট সিরিজে নিজের গতিতে পরাস্ত করেন নাহিদ। বাবর আজম রানার এক্সপ্রেস গতির সামনে বেশ কয়েকবার পরাস্ত হয়েছেন, যা বিশ্বজুড়ে ক্রিকেট ভক্তদের মাঝে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
উপসংহার: দেশের গৌরব বনাম ফ্র্যাঞ্চাইজির মোহ
নাহিদ রানার মতো তরুণ প্রতিভার সামনে এখন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ। আইপিএলের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোতে তার ডাক পাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে তামিম ইকবালের এই সতর্কবার্তাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। তরুণ খেলোয়াড়দের যেমন আর্থিক নিরাপত্তার প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি দেশের ক্রিকেটের ঐতিহ্য ও গৌরব ধরে রাখতে জাতীয় দলের প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নাহিদ রানা ও অন্যান্য তরুণ ক্রিকেটাররা কীভাবে এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।