Ros Rivaz appointed to ICC board as independent director – আইসিসি বোর্ডে নতুন স্বতন্ত্র পরিচালক ডক্টর রস রিভাজ: এক নতুন যুগের সূচনা
Contents
আইসিসি বোর্ডে নতুন স্বতন্ত্র পরিচালক: ডক্টর রস সি রিভাজের নিযুক্তি
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) তাদের পরিচালনা পর্ষদকে আরও শক্তিশালী ও বৈচিত্র্যময় করতে একটি বড় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বহুজাতিক করপোরেট জগতে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ডক্টর রস সি রিভাজকে আইসিসি বোর্ডের নতুন স্বতন্ত্র পরিচালক (Independent Director) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর এই নিয়োগের মাধ্যমে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ সংস্থায় করপোরেট সুশাসন ও কৌশলগত ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এক নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে। ডক্টর রিভাজ প্রাথমিকভাবে তিন বছরের মেয়াদে এই দায়িত্ব পালন করবেন। তবে পারফরম্যান্স ও বোর্ডের সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে তাঁর এই মেয়াদ আরও সর্বোচ্চ তিন বছরের জন্য বৃদ্ধি করা যেতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে ছয় বছরের একটি দীর্ঘস্থায়ী অবদান রাখার সুযোগ তৈরি করবে।
করপোরেট জগতের এক অনন্য নেতৃত্ব
ডক্টর রস রিভাজ বিশ্বজুড়ে করপোরেট গভর্ন্যান্স, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এক অনন্য নাম। বর্তমানে তিনি ইংল্যান্ডের অন্যতম বৃহৎ পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাংলিয়ান ওয়াটার’-এর চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর পাশাপাশি তিনি ইউরোপভিত্তিক আন্তর্জাতিক মেটেরিয়াল সায়েন্স কোম্পানি ‘অ্যাপেরাম এসএ’ (Aperam SA) এবং ‘ভিক্ট্রেক্স পিএলসি’ (Victrex plc)-এর লিড ইন্ডিপেন্ডেন্ট ডিরেক্টর হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন ব্লু-চিপ কোম্পানিতে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী পদে কাজ করার দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। আইসিসির পক্ষ থেকে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ডক্টর রিভাজের এই দীর্ঘ পথচলা এবং অভিজ্ঞতা আইসিসি বোর্ডকে কৌশলগত পরিকল্পনা নির্ধারণ, ঝুঁকি নিরূপণ এবং কর্মক্ষমতা বা পারফরম্যান্স ব্যবস্থাপনায় এক নতুন ও সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করবে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ডক্টর রিভাজ তাঁর কর্মজীবনে সবসময়ই একজন অত্যন্ত সক্রিয় এবং দায়িত্বশীল বোর্ড সদস্য হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি কেবল নীতিনির্ধারণী বৈঠকেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সম্প্রদায়ের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করেছেন। মাঠপর্যায়ে গিয়ে কাজের তদারকি এবং স্টেকহোল্ডারদের সাথে সরাসরি মিথস্ক্রিয়া করার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ সুনাম রয়েছে। সুশাসন, করপোরেট কৌশল এবং কার্যক্ষমতার ওপর তাঁর গভীর জ্ঞান আইসিসি বোর্ডকে আরও কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করবে। একই সাথে, বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ (Diversity and Inclusion) তৈরির প্রতি তাঁর দৃঢ় প্রতিশ্রুতি আইসিসিকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা ও নারী ক্ষমতায়নে অবদান
কেবল করপোরেট জগতেই নয়, সামাজিক উন্নয়ন ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমেও ডক্টর রস রিভাজের অবদান অনস্বীকার্য। তরুণীদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত (STEM) শিক্ষায় উৎসাহিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত অত্যন্ত জনপ্রিয় ‘ইউর-লাইফ’ (Your-Life) ক্যাম্পেইনে তিনি সক্রিয় সমর্থন ও অবদান রেখে চলেছেন। নারীদের প্রযুক্তিগত শিক্ষায় এগিয়ে নেওয়ার এই প্রয়াস সমাজের জেন্ডার বৈষম্য দূর করতে দারুণ ভূমিকা রাখছে। এছাড়া তিনি ঐতিহ্যবাহী সাউদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Southampton) কাউন্সিলের চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর উচ্চমানের নেতৃত্বের প্রমাণ বহন করে। এর পাশাপাশি তিনি স্থানীয় বিভিন্ন কমিউনিটি প্রজেক্ট এবং বিশ্ববিখ্যাত দাতব্য সংস্থা ‘ওয়াটার এইড’-এর মতো সংগঠনের সাথেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থেকে সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে চলেছেন। সামাজিক দায়বদ্ধতার এই বিশাল অভিজ্ঞতা ক্রিকেটের মতো একটি বিশ্বজনীন খেলার সামাজিক উন্নয়নেও বড় প্রভাব ফেলবে বলে ক্রিকেট বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আইসিসিতে যোগদান এবং ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা
আইসিসি বোর্ডে যোগদানের পর নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ডক্টর রস রিভাজ বলেন, “ক্রিকেটের মতো এমন একটি আকর্ষণীয় ও প্রভাববিস্তারকারী খেলার অত্যন্ত রোমাঞ্চকর সময়ে আইসিসি বোর্ডে যোগ দিতে পারা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের। ক্রিকেট প্রতিনিয়ত নতুন নতুন দর্শক ও সমর্থকদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোকে অনুপ্রাণিত করছে এবং বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী খেলা হিসেবে নিজের অবস্থানকে আরও সুসংহত করছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমি আইসিসির চেয়ারম্যান, বোর্ডের অন্যান্য সদস্য এবং সামগ্রিক ক্রিকেট পরিবারের সাথে একযোগে কাজ করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। খেলার এই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে এবং একে এগিয়ে নিয়ে যেতে আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিশ্বের সকল প্রান্তে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করতে এবং এই খেলার ধারাবাহিক সাফল্য নিশ্চিত করতে শক্তিশালী সুশাসন, দীর্ঘমেয়াদী চিন্তাভাবনা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি অবলম্বন করা অত্যন্ত জরুরি।” ডক্টর রিভাজের এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, তিনি ক্রিকেটের বিশ্বায়নে করপোরেট সুশাসনকে মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান।
আইসিসির স্বতন্ত্র পরিচালক পদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
আইসিসি বোর্ডে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের বিষয়টি নতুন নয়, তবে এর পেছনে একটি দীর্ঘ সংস্কারের ইতিহাস রয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে পেপসিকো (PepsiCo)-এর প্রাক্তন চেয়ারপারসন ও প্রধান নির্বাহী ইন্দ্রা নুয়ী আইসিসির প্রথম নারী স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত হয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন। আইসিসির সংবিধানে ব্যাপক সংস্কার ও পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এই স্বতন্ত্র পরিচালকের পদটি সৃষ্টি করা হয়েছিল।
এই পরিবর্তনের সাথে ক্রিকেটের ইতিহাসে বহুল আলোচিত এবং বিতর্কিত ‘উলফ রিপোর্টের’ (Woolf Report) একটি গভীর মিল রয়েছে। লর্ড উলফের নেতৃত্বে তৈরি হওয়া সেই রিপোর্টে আইসিসির প্রশাসনে আরও বেশি নিরপেক্ষ ও স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের জোরালো সুপারিশ করা হয়েছিল, যাতে সংস্থার কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়। যদিও তৎকালীন সময়ে সেই রিপোর্টের অনেক সুপারিশই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, তবে সময়ের সাথে সাথে আইসিসি বুঝতে পেরেছে যে বৈশ্বিক ক্রীড়া সংস্থা হিসেবে টিকে থাকতে হলে এবং নিজেদের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে হলে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গির কোনো বিকল্প নেই। ডক্টর রস রিভাজের নিয়োগ সেই সুশাসন ও স্বচ্ছতার পথকেই আরও সুদৃঢ় করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপসংহার
ডক্টর রস সি রিভাজের মতো একজন উচ্চমানের করপোরেট ব্যক্তিত্বের আইসিসি বোর্ডে আগমন নিঃসন্দেহে বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য একটি ইতিবাচক বার্তা। তাঁর দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং বৈচিত্র্যের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার আইসিসিকে একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্রীড়া সংস্থায় রূপান্তর করতে সাহায্য করবে। ক্রিকেটের বর্তমান বিশ্বায়ন এবং নতুন দর্শকদের আকর্ষণের এই যুগে তাঁর দূরদর্শী সিদ্ধান্তগুলো আইসিসিকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করবে।