জশ হ্যাজেলউড: ভুবনেশ্বর কুমার স্টার্ক এবং কামিন্সের মতোই দুর্দান্ত
Contents
ভুবনেশ্বর কুমার এবং জশ হ্যাজেলউড: আরসিবির বোলিং আক্রমণের নতুন রসায়ন
আইপিএলের মঞ্চে অনেক সময় আন্তর্জাতিক তারকাদের মধ্যে এমন এক মেলবন্ধন তৈরি হয় যা ক্রিকেট বিশ্বের নজর কেড়ে নেয়। রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর (RCB) শিবিরে বর্তমান মৌসুমে তেমনই এক দারুণ জুটি তৈরি হয়েছে জশ হ্যাজেলউড এবং ভুবনেশ্বর কুমারের মধ্যে। অস্ট্রেলিয়ার কিংবদন্তি পেসার জশ হ্যাজেলউড দাবি করেছেন যে, ভুবনেশ্বর কুমারের মতো অভিজ্ঞ বোলারের সাথে বোলিং করার সময় তিনি মিচেল স্টার্ক বা প্যাট কামিন্সের অভাব একেবারেই অনুভব করেন না।
হ্যাজেলউড, স্টার্ক এবং কামিন্স—এই তিনজন মিলে অস্ট্রেলিয়ার পেস বোলিংয়ের যে ত্রয়ী গঠন করেছেন, তা বিশ্ব ক্রিকেটে অত্যন্ত ভীতি জাগানিয়া। তবে আইপিএলের প্রেক্ষাপটে ভুবনেশ্বর কুমার যে সেই একই মানের প্রভাব ফেলতে পারেন, তা হ্যাজেলউডের বক্তব্যে স্পষ্ট। ভুবনেশ্বর বর্তমানে আইপিএলের অন্যতম সফল বোলার হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করছেন এবং তার পারফরম্যান্স রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বোলিং বিভাগকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে।
পার্পল ক্যাপের দৌড়ে ভুবনেশ্বর কুমারের আধিপত্য
চলতি আইপিএল মৌসুমে ভুবনেশ্বর কুমারের পারফরম্যান্স রীতিমতো ঈর্ষণীয়। ১২টি ম্যাচ খেলে তিনি ইতিমধ্যে ২২টি উইকেট শিকার করেছেন এবং বর্তমানে তিনি পার্পল ক্যাপের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছেন। নতুন বলে তার সুইং এবং নিখুঁত লাইন-লেংথ ব্যাটারদের জন্য বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে পাওয়ার প্লে ওভারে রান আটকে রাখা এবং উইকেট তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছেন।
হ্যাজেলউড এবং ভুবনেশ্বর মিলে এই মৌসুমে আরসিবির বোলিং আক্রমণকে শক্তিশালী করে তুলেছেন। ফ্ল্যাট উইকেটে যেখানে ব্যাটাররা দাপট দেখান, সেখানেও এই দুজনে অত্যন্ত মিতব্যয়ী বোলিং করেছেন। পাওয়ার প্লে-তে ভুবনেশ্বরের সুইং এবং হ্যাজেলউডের বাউন্স প্রতিপক্ষ দলের ব্যাটিং লাইনআপকে শুরুতেই বড় ধাক্কা দিচ্ছে। শুধু পাওয়ার প্লে নয়, ইনিংসের শেষ দিকে অর্থাৎ ডেথ ওভারেও এই জুটি সমানভাবে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।
স্টার্ক এবং কামিন্সের সাথে তুলনা: হ্যাজেলউডের বিশ্লেষণ
ভুবনেশ্বর কুমারের বোলিং স্টাইল নিয়ে বলতে গিয়ে হ্যাজেলউড একটি আকর্ষণীয় তুলনা টেনেছেন। তিনি বলেন, ‘ভুবনেশ্বরের সাথে বোলিং করাটা অনেকটা অস্ট্রেলিয়ার হয়ে প্যাট কামিন্স এবং মিচেল স্টার্কের সাথে বোলিং করার মতোই মনে হয়। ভুবনি সম্ভবত বল একটু বেশি ওপরের দিকে পিচ করে এবং সুইং করায়। অন্যদিকে আমি সিম মুভমেন্ট এবং বাউন্স ব্যবহার করতে পারি। বোলিং আক্রমণে এই ধরনের ভারসাম্য থাকা খুবই জরুরি। গত বছর এবং এই বছর আমাদের আক্রমণে খুব সুন্দর একটি মিশ্রণ তৈরি হয়েছে।’
হ্যাজেলউড মনে করেন, বোলিং আক্রমণে বৈচিত্র্য থাকলে ব্যাটারদের পক্ষে সেট হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ভুবনেশ্বর কুমারের সুইং এবং হ্যাজেলউডের সিম বোলিং একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করছে, যা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বোলিং দর্শন এবং মানসিক দৃঢ়তা
জশ হ্যাজেলউড আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একজন অভিজ্ঞ বোলার। যদিও চলতি মৌসুমে তিনি ৯টি ম্যাচে ১১টি উইকেট পেয়েছেন, কিন্তু তার বোলিং বিশ্লেষণ কেবল উইকেটের সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। একজন বোলারের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা সম্পর্কে তার এক অনন্য দর্শন রয়েছে।
হ্যাজেলউড বলেন, ‘যদি আপনি একটি ফ্ল্যাট উইকেটে বোলিং করেন এবং ৪ ওভারে ৪০ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন, যেখানে বাকিরা ৫০ বা ৬০ রান দিচ্ছে, তবে আমি মনে করি সেটি অত্যন্ত সন্তোষজনক একটি খেলা।’ তিনি আরও যোগ করেন যে, অনেক সময় ব্যাটাররা আক্রমণাত্মক মেজাজে থাকে এবং প্রথম ওভারেই হয়তো ২০ রান দিয়ে দিতে হয়। কিন্তু সেখান থেকে ইয়র্কার বা গতির পরিবর্তন করে ম্যাচে ফিরে আসা এবং শেষ পর্যন্ত সম্মানজনক ফিগার বজায় রাখাটাই আসল চ্যালেঞ্জ। এই ধরনের লড়াই হ্যাজেলউডকে ব্যক্তিগতভাবে অনেক বেশি গর্বিত করে।
দলের ভারসাম্য এবং অন্যান্য বোলারদের ভূমিকা
আরসিবির বোলিং ইউনিটের ভারসাম্য নিয়ে জশ হ্যাজেলউড বেশ সন্তুষ্ট। যদিও এই বছর দলে বাঁহাতি পেসার হিসেবে যশ দয়াল নেই, তবে তার জায়গা রাসিখ সালাম বেশ ভালোভাবে পূরণ করেছেন। হ্যাজেলউডের মতে, দলে একজন লেগস্পিনার (সুয়াশ শর্মা) এবং একজন বাঁহাতি স্পিনার (ক্রুণাল পান্ডিয়া) থাকায় বোলিং বিভাগ বেশ স্বয়ংসম্পূর্ণ।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এই দলের সেটআপ অনেকটা অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় দলের মতো মনে হয়—যেখানে প্রতিটি বিভাগ কভার করা হয়েছে। যদি আপনার তিনজন বোলার একই ধরনের স্টাইলে বল করে, তবে ব্যাটাররা সহজেই বুঝে যায় কী হতে চলেছে। কিন্তু ভিন্ন দক্ষতা এবং ভিন্ন স্টাইলের বোলার থাকলে ব্যাটারদের কাজ কঠিন হয়ে পড়ে।’ ৩৫ বছর বয়সী এই অজি পেসারের মতে, এই বৈচিত্র্যই আরসিবিকে টুর্নামেন্টে এগিয়ে রাখছে।
উপসংহার
ভুবনেশ্বর কুমারের মতো একজন ভারতীয় কিংবদন্তির সাথে জশ হ্যাজেলউডের এই বোঝাপড়া আরসিবির জন্য বড় প্লাস পয়েন্ট। হ্যাজেলউডের করা মিচেল স্টার্ক এবং প্যাট কামিন্সের সাথে ভুবনেশ্বরের তুলনা কেবল একজন সতীর্থের প্রশংসা নয়, বরং এটি ভুবনেশ্বরের বছরের পর বছর ধরে বজায় রাখা ধারাবাহিকতার স্বীকৃতি। আইপিএলের শেষ লগ্নে এই বোলিং জুটি আরসিবিকে কতদূর নিয়ে যেতে পারে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।