‘You’re delaying my lunch’ – Williamson revels in final Lord’s bow – লর্ডসে শেষ টেস্টের আগে কেন উইলিয়ামসন
Contents
লর্ডসে শেষ বিদায়ের রাগিণী এবং এক টুকরো স্মৃতিকাতরতা
ক্রিকেটের মক্কা খ্যাত লর্ডস ক্রিকেট গ্রাউন্ডের সবুজ গালিচা আর ঐতিহ্যবাহী লং রুমের সাথে নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটার কেন উইলিয়ামসনের সম্পর্কটা এক যুগেরও বেশি সময়ের। মঙ্গলবার যখন উইলিয়ামসন সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তখন তিনি হয়তো ভাবেননি যে এটিই হতে যাচ্ছে লর্ডসের ঐতিহাসিক পিচে তাঁর শেষ টেস্ট ম্যাচ। সংবাদ সম্মেলনের এক পর্যায়ে যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে আসন্ন প্রথম টেস্টটিই লর্ডসে তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ হতে যাচ্ছে, তখন তিনি বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কৌতুক করে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘You’re delaying my lunch’ – Williamson revels in final Lord’s bow। হ্যাঁ, লর্ডসের মধ্যাহ্নভোজের ঐতিহ্য এতটাই অনন্য যে কেন উইলিয়ামসন তাঁর এই শেষ যাত্রার প্রতিটি মুহূর্ত এবং প্রতিটি মধ্যাহ্নভোজ মন ভরে উপভোগ করতে চান। যদি সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে, তবে ৩৫ বছর বয়সী এই কিংবদন্তি ব্যাটার লর্ডসে আরও ছয়টি চমৎকার লাঞ্চ উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।
স্মৃতির পাতায় লর্ডস: শুরু থেকে বর্তমানের পথচলা
লর্ডসের মাঠে কেন উইলিয়ামসনের পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১২ সালে। গ্লুচেস্টারশায়ারের হয়ে একজন বিদেশি রিক্রুট হিসেবে মিডলসেক্সের বিপক্ষে ক্লাইডসডেল ব্যাংক প্রো-৪০ ম্যাচ খেলতে প্রথমবার এই মাঠে নেমেছিলেন তিনি। এরপর ২০১৩ সালে নিউজিল্যান্ডের হয়ে লর্ডসের মাটিতে প্রথম টেস্ট খেলেন, যা ছিল তাঁর আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্যারিয়ারের ২৪তম ক্যাপ। আর আগামী বৃহস্পতিবার যখন তিনি মাঠে নামবেন, তখন সেটি হবে তাঁর ক্যারিয়ারের ১১০তম টেস্ট ম্যাচ। দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময়ের এই যাত্রায় লর্ডসের সাথে তাঁর জড়িয়ে রয়েছে বহু স্মৃতি।
চারটি টেস্ট ম্যাচ ছাড়াও এই মাঠে তাঁর একমাত্র প্রথম-শ্রেণীর ম্যাচটি ছিল ২০১৪ সালে ইয়র্কশায়ারের হয়ে। সেই ম্যাচটি নিয়ে একটি মজার ঘটনা রয়েছে। প্রতিপক্ষ মিডলসেক্স ৪৭২ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করে মাত্র ৩ উইকেট হারিয়ে জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল। সেই ম্যাচে ইয়র্কশায়ারের নেতৃত্ব দেওয়া জো রুটকে তাঁর সতিনিধিরা কৌতুক করে ‘ক্র্যাপ্টেন’ (craptain) উপাধি দিয়েছিলেন।
চুক্তির জটিলতা এবং শেষবারের মতো এনডব্লিউ৮ (NW8)-এ পদার্পণ
গত গ্রীষ্মে উইলিয়ামসন মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) সাথে একটি বিশেষ চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন, যা তাঁকে একই সাথে মিডলসেক্স এবং এমসিসির হানড্রেড দল লন্ডন স্পিরিটের হয়ে খেলার সুযোগ করে দেয়। এর আগে তিনি নিউজিল্যান্ড ক্রিকেটের কেন্দ্রীয় চুক্তি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন, যার ফলে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুটি টেস্ট ম্যাচ তিনি মিস করেছিলেন। বর্তমানে ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে এসে কোনো জাতীয় চুক্তি ছাড়াই খেলছেন এই ব্যাটার। ২০২৭ সালের পর ফিউচার ট্যুরস প্রোগ্রামে (FTP) নিউজিল্যান্ডের পরবর্তী ইংল্যান্ড সফরের সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায়, লর্ডসের মাটিতে এটিই কেন উইলিয়ামসনের শেষ ম্যাচ হতে যাচ্ছে। তাই উত্তর-পশ্চিম লন্ডনের এই বিখ্যাত এনডব্লিউ৮ (NW8) পোস্টকোডের মাঠে নিজের শেষ সপ্তাহটিকে পুরোপুরি উপভোগ করতে চান তিনি।
লর্ডসের অনন্য ঐতিহ্য এবং উইলিয়ামসনের গভীর অনুভূতি
লর্ডসে খেলার অনুভূতি সবসময়ই আলাদা এবং বিশেষ। এই প্রসঙ্গে উইলিয়ামসন বলেন, ‘আপনার ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে বুঝতে পারবেন যে, লর্ডসে এসে খেলার সুযোগ আপনি খুব বেশি পাবেন না। এটা নির্ভর করে আপনি কতদিন ধরে খেলছেন তার delicacies ওপর। তবে হ্যাঁ, আমি দীর্ঘদিন ধরে খেলছি এবং লর্ডসে খেলার মতো দারুণ সুযোগ আমার জীবনে মাত্র কয়েকবারই এসেছে।’
লর্ডসের ঐতিহ্য রক্ষায় যে ধরনের যত্ন নেওয়া হয়, তা সত্যিই অনন্য। উইলিয়ামসন এই ঐতিহ্যের প্রশংসা করে বলেন, ‘এখানকার ইতিহাস এবং এর পেছনে যে পরিমাণ প্রচেষ্টা রয়েছে, তা লর্ডসকে অন্য সব মাঠ থেকে আলাদা করে তোলে। ঐতিহ্যবাহী লং রুমের মধ্য দিয়ে হেঁটে পিচে যাওয়া, সদস্যদের সাথে কুশল বিনিময় করা এবং এখানকার আইকনিক লাঞ্চ—সবকিছুই ভীষণভাবে স্মৃতির পাতায় গেঁথে থাকে। এখানে খেলার অভিজ্ঞতা সত্যি অসাধারণ এবং আমাদের ড্রেসিংরুমের অনেক তরুণ খেলোয়াড় এবারই প্রথম লর্ডসে খেলবে, যা নিয়ে তারা অত্যন্ত রোমাঞ্চিত।’
নিউজিল্যান্ডের বর্তমান স্কোয়াডের মাত্র ছয়জন খেলোয়াড় ২০২২ সালের লর্ডস টেস্টে খেলেছিলেন, যা ছিল পূর্ণকালীন টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে বেন স্টোকসের প্রথম ম্যাচ। ট্রেন্ট বোল্টের সাথে সেবার পেস আক্রমণ সামলানো টিম সাউদি এবার ইংল্যান্ড দলের বোলিং পরামর্শক হিসেবে ড্রেসিংরুমে উপস্থিত থাকবেন।
অনার্স বোর্ডে নাম এবং ২০১৫ সালের সেই স্মরণীয় সেঞ্চুরি
লর্ডসে কেন উইলিয়ামসনের সামগ্রিক রেকর্ড হয়তো তাঁর ক্যারিয়ারের গড়ের সাথে ঠিক খাপ খায় না। লর্ডসে আটটি ইনিংসে তাঁর ব্যাটিং গড় মাত্র ৩২, যা তাঁর ক্যারিয়ারের টেস্ট গড় ৫৪.৫৮ এর চেয়ে অনেক কম। তবে লর্ডসের বিখ্যাত অ্যাওয়ে ড্রেসিংরুমের অনার্স বোর্ডে তাঁর নাম খোদাই করা আছে। ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা দুই ব্যাটার শচীন টেন্ডুলকার এবং ব্রায়ান লারার মতো কিংবদন্তিরাও যা অর্জন করতে পারেননি, উইলিয়ামসন তা করে দেখিয়েছেন।
২০১৫ সালের গ্রীষ্মের প্রথম টেস্টে তিনি দুর্দান্ত এক ইনিংস খেলেছিলেন। সেই ম্যাচে তিনি ১৩২ রানের এক অসাধারণ সেঞ্চুরি করেন, যা তাঁর ক্যারিয়ারের ৩৩টি টেস্ট সেঞ্চুরির অন্যতম সেরা। যদিও ম্যাচটি শেষ দিনে গিয়ে ট্রেন্ট বোল্টের বলে মঈন আলীর নেওয়া দুর্দান্ত এক ক্যাচে নিউজিল্যান্ডের পরাজয়ের মাধ্যমে শেষ হয়েছিল। তবে সেই রোমাঞ্চকর ম্যাচটি ইংল্যান্ডের টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি দর্শকদের আগ্রহকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছিল। তৎকালীন ব্ল্যাক ক্যাপস অধিনায়ক এবং বর্তমান ইংল্যান্ডের হেড কোচ ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ১১ বছর পর আবারও তেমন কিছু একটার প্রত্যাশায় থাকবেন।
সেই ২০১৫ সালের ম্যাচ এবং অনার্স বোর্ডের স্মৃতিচারণ করে উইলিয়ামসন বলেন, ‘অনার্স বোর্ড নিয়ে মানুষ অনেক কথা বলে। সত্যি বলতে, সেটি ছিল ক্রিকেটের এক অসাধারণ ম্যাচ। আমরা শেষ পর্যন্ত ১২৪ রানে হেরে গিয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমরা ৭০০ রান সংগ্রহ করেছিলাম এবং প্রতিপক্ষের ২০টি উইকেটই তুলে নিয়েছিলাম। সাধারণ যেকোনো দিন এমন পারফরম্যান্সে আমরা খুবই খুশি থাকতাম।’
উইলিয়ামসন আরও যোগ করেন, ‘উইকেটটি ব্যাটিংয়ের জন্য বেশ ভালো ছিল। তবে হঠাৎ করেই মাথার ওপর মেঘের আনাগোনা শুরু হয় এবং ফ্লাডলাইট জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তখন ডিউক বলের বিপক্ষে খেলাটা হঠাৎ করেই ভীষণ কঠিন হয়ে পড়েছিল। এটি ইংল্যান্ডে ক্রিকেট খেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। অনেক আগের কথা হলেও, সেই স্মৃতি আমার মনে আজও অমলিন হয়ে আছে।’ লর্ডসের শেষ ম্যাচে বিদায় নেওয়ার আগে কেন উইলিয়ামসন আবারও সেই চিরচেনা ঐতিহ্যের স্বাদ পেতে মুখিয়ে আছেন।